সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ! বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৪)

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ! বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৪)
সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ! বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৪)

ড. নূরুল ইসলাম, পিপিএন বাংলা: সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় রাজনীতিতে কিছু নেতিবাচক শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।যে শব্দ গুলো এখন রাজনৈতিক পরিভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। এমন একটি পরিভাষা ‘মেরুকরণ’ Polarization।

কিছু স্বার্থাম্বেসী মানুষ সমস্বার্থ অথবা সহবিশ্বাসী মানুষকে সংকীর্ণ স্বার্থে Polarize and mobilize করে। এই মেরুকরণ ও সংহতিকরণ প্রক্রিয়া একটি নিন্দনীয় নেতিবাচক কৌশল।

এদেশে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে এক শ্রেণীর মানুষ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে শিখন্ডী করে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বিভাজন এবং বৈষম্য ও ঘৃণার দেওয়াল নির্মাণ করে চলেছে।

স্বাধীনতার প্রাক্ কালে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সক্রিয় মেরুকরণ ও সংহতিকরণ প্রক্রিয়া দেশ বিভাজন ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্ম দেয়। এই ঘৃণ্য প্রক্রিয়ার শিকার হয় কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। নিহত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। ধর্ষিত হয় হাজার হাজার মহিলা। ছিন্নমূল হয় কোটি কোটি হিন্দু ও মুসলিম। যার উত্তর-প্রভাব আজও কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে দূর্বীসহ করে চলেছে।

দেশ ভাগের পর বিভাজিত উপমহাদেশের — পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রভাব গৌণ হয়ে যায়। ফলে, সেখানে এখন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অস্তিত্ব নেই। তার অর্থ এই নয় যে, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সেখানে কোনো সমস্যা নেই। পৃথিবীর সর্বত্রই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় জীবন ও জীবিকা নিয়ে কমবেশি সমস্যাক্রান্ত।

তবে, ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় অদ্ভুত এক ধরণের সংকটাক্রান্ত। ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বৃহৎ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যাগত গুরুত্ব ও প্রভাব আছে। তাদের সমভোটাধিকার আছে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার অধিকার তাদের সংকোচিত। মুসলিম নিবিড় কেন্দ্র গুলো হয় তফশিল জাতি বা উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত অথবা বর্ণ হিন্দু প্রভাবশালী নেতার খাস তালুকে পরিণত হয়েছে। হিন্দু নিবিড় এলাকা থেকে মুসলিম প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তা প্রায় অসম্ভব। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হওয়ার অধিকার হোক অথবা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ –সর্বত্রই তারা ব্রাত্য। বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার।

এমন কি, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশাল সংখ্যক মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ের সমভোটাধিকার দিতে রাজি নয়। শুধু তাই নয়, তাদের অস্তিত্বও স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। এজন্য তারা প্রচ্ছন্ন ও প্রত্যক্ষভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন ও নিরবিচ্ছিন্ন এক যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের এক তরফা চাপিয়ে দেয়া এই যুদ্ধে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ও উন্নয়ন।

তাদের অসহিষ্ণুতা দেশে এক গৃহযুদ্ধের আবহ তৈরি করছে। তবে, কথিত এই গৃহযুদ্ধের জন্য মুসলিমদের কোনো প্রস্তুতি নেই। তারা স্বপ্নেও ভাবেনা পাল্টা আঘাত হানা বা প্রতিরোধ করার কৌশল উদ্ভাবনের। তারা এখন আত্মরক্ষা করতেও‌ সক্ষম নয়। প্রতিটি দাঙ্গা বা মুসলিম বিরোধী গণহত্যায় তা প্রমাণিত হয়েছে। শত্রু সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যে রকম নির্ভূল রণকৌশল থাকে, অনুরূপ রণকৌশল ও কমান্ডের অধীনে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়া এটা সম্ভব নয়। একথা বম্বে দাঙ্গা প্রসঙ্গে সরকার নিয়োজিত শ্রীকৃষ্ণ আয়োগের প্রধান বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং একথা বলেছেন। এই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ভয়াবহ পরিণতি।

মজার বিষয়, এদেশের ক্ষমতাসীন বর্ণহিন্দু শ্রেণী নিজেদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি ও ঈশ্বরের নির্বাচিত একমাত্র সৃষ্টি মনে করে। যেমন ইহুদীরা মনে করে।

এই কাল্টের বিশ্বাসের ভিত্তি ও মূলনীতি: বৈষম্য, ঘৃণা, বিদ্ধেষ ও সহিংসতা। তারা নিজেদের অহিংস ও শান্তিকামী বলতে ভালোবাসে। কিন্তু তারাই সহিংস দাঙ্গার বা গণহত্যার নেতৃত্ব দেয়। ক্ষমতার জন্য যেকোনো অপরাধ করতে তারা প্রস্তুত। এই মুহুর্তে কয়েক লক্ষ মিলিশিয়া বাহিনী তারা প্রস্তুত করে রেখেছে– কাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য? এই লক্ষ লক্ষ যুবকের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভয়ানক ঘৃণা ও বিদ্ধেষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। ভয়ানক দিন আসন্ন!

বহু মুসলিম মনে করে, এদেশে মুসলিমদের গণতান্ত্রিক অধিকার আজ প্রহসনে পরিণত হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার আছে কিন্তু কোনো চয়েস নেই। তাদের সামনে কোনো অপশন নেই। তারা শুধু বিবেচনা করে, কে বা কোন দল মুসলিমদের জন্য কম ক্ষতিকারক। নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বে তাদের অংশীদারিত্ব দেখলেই সব কিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। কুড়ি-পঁচিশ কোটি মানুষের বিশাল সংখ্যা থাকা সত্ত্বেও মুসলিমরা সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে প্রায় ব্রাত্য। বলা হয়, সব শ্রেণীর মানুষের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শান্তি, সহাবস্থান ও সকলের বিকাশের কথা বললেও মুসলিমদের জন্য এগুলো কতটা প্রযোজ্য, তা পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যাবে।

এক শ্রেণীর মুসলিম ও অমুসলিম শুভান্যুধায়ী বুদ্ধিজীবিরা পরামর্শ দেন, মুসলমানদের সতর্কভাবে রাজনীতি করা উচিৎ। তারা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করলে, হিন্দুরা নাকি মেরুকৃত হবে। সাম্প্রদায়িকভাবে আরো সুসংহত হবে।

আমার মনে হয়, তাদের এই ভাবনা বিভ্রান্তিকর। বস্তুতঃ মেরুকরণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে প্রায় সুসম্পন্ন হয়েছে। যদিও শেষ হয়নি। এক বিখ্যাত হিন্দু লেখক প্রণীত The Dalit Mobilization for Upper Caste Communalism গ্রন্থটি পড়ে আমার মনে হলো মেরুকরণ ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্বের এক বৃহৎ রণকৌশলের অংশমাত্র। এখানে দেখানো হয়েছে বর্ণ হিন্দু ছাড়াও দলিতদের কিভাবে এই মেরুকরণের আওতায় আনা হচ্ছে।

হ্যাঁ, মুসলিম ঐক্য ও সংহতি নাকি হিন্দুদের আরো বেশি মেরুকরণে উৎসাহিত করবে, সেজন্য মুসলিমদের রাজনৈতিক দল গঠন ও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এই সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক তা ভেবে দেখা দরকার। একজন আসাদুদ্দিন সংসদে দাঁড়িয়ে বিশ্বের সামনে ভারতীয় মুসলমানদের করুন অবস্থা নির্ভীক ভাবে তুলে ধরতে পারে। দেশের প্রভাবশালী নেতাদের বিবেকে আঘাত করতে পারে। কিন্তু হিন্দু প্রভাবিত রাজনৈতিক দলের দলদাস মুসলিম জনপ্রতিনিধিরা কখনও সে দুঃসাহস দেখাতে সক্ষম হয়নি। তারা নির্বাক ও নিরীহ গোবেচারার ন্যায় নিজ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য, ঘৃণা, হিংসা ও দাঙ্গা সংঘটিত হতে দেখেছে। তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

গতিশীল ও সৃজনশীল ভাবনা ছাড়া কোনো পরিবর্তন আসবেনা।

Comment

Please enter your comment!
Please enter your name here