ধর্মনিরপেক্ষতার প্রহরী! বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৬)

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রহরী! বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৬)
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রহরী! বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৬)

অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম, পিপিএন বাংলা: ১৯৪৭ সালে রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ফলে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়। বৃটিশ বিরোধী এই সংগ্রামে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ জীবন ও সম্পদ দিয়ে  লড়াই করেন। সত্য বলতে কি, এই লড়াইয়ের চরিত্র নির্ভেজাল ধর্মনিরপেক্ষ ছিলনা। বিশাল সংখ্যক মানুষ কট্টর সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে বিশ্বাসী ছিলেন। স্বাধীন ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে তারা প্রানান্ত চেষ্টা করেছিলেন। আবার কিছু মানুষ হিন্দু রাষ্ট্র থেকে পরিত্রাণ চেয়ে স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে দেশ স্বাধীন ও বিভাজন হয়।

দৃশ্যতঃ পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ  ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সেক্যুলার। কিন্তু তাদের আন্দোলন ছিল সাম্প্রদায়িক। তারা ইসলামের নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। যদিও সে রাষ্ট্রে কখনই ইসলামী অনুশাসন প্রচলন হয়নি।

https://youtu.be/Uql2W1Bk65c

ভারতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পাকিস্তান আন্দোলনের চেয়েও প্রাচীন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত বহু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছিলেন সেক্যুলার ও দূরদর্শী।  হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার কারণে তারা ভারত রাষ্ট্রের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ শাসনতন্ত্র গ্রহণ করেন।

সত্য বলতে কি, রামরাজ্য তথা হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা না করে মুসলমানদের জন্য কেউ করুণা করেছে ভাবলে সে মূর্খের স্বর্গে বাস করছে। মুসলিমরা সেকালে যেমন হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা ঠেকাতে সক্ষম ছিলনা, আজও তারা সক্ষম নয়। হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বর্ণ হিন্দুদের আন্দোলন। অনার্য দলিত, দ্রাবিড় ও সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রীস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও পার্সিরা নিশ্চিত এই আন্দোলনে শরিক হবেনা। হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করার সংকল্প ও শপথ নিয়ে ক্ষমতাসীন এই সরকার। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ঘোষিত রাম সেনা মোদীও পারলেন না হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করতে।

বস্তুতঃ স্বাধীন ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ও নেতিবাচক। তারা কখনই জাতীয় নেতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেননি। হিন্দু জাতীয় নেতারা যতটুকু হিস্সা দিলে তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা যায়, সেটুকুই তাদের দিয়েছেন। মুসলিম নেতাদের স্বতন্ত্র কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব নেই। মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলদাস ছাড়া আর কি মনে করে বলতে পারবোনা।

পরিতাপের বিষয়, হিন্দুরা ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে নির্দ্বিধায় মেরুকরণ চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম বিরোধী হিন্দু মেরুকরণ। ব্রাহ্মণ বিরোধী দলিত মেরুকরণ। পশ্চাদপদ শ্রেণীর হিন্দু মেরুকরণ। কিন্তু আকাশ ভেঙে পড়বে শুধু মুসলিম মেরুকরণ হলে।

এই মুহুর্তে ভারতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংবিধান সুরক্ষার দায়িত্ব মুসলিমদের। ক্ষমতাসীন রামবাদী দল ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ পরিভাষার প্রকাশ্য বিরোধী। বর্ণ হিন্দুরা ‘অস্পৃশ্য’ আম্বেদকর প্রণীত সংবিধানের আমূল পরিবর্তন চাইছে। তারা প্রকাশ্য রাজপথে সংবিধান জ্বালিয়ে তাদের বিরোধীতার মাত্রা বুঝিয়ে দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভয়ানক নেতিবাচক। স্বাধীনতার পর থেকে বামপন্থী দলগুলোর ক্ষমতাসীন হওয়া পর্যন্ত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ কংগ্রেসের সরকার উপর্যুপরি দাঙ্গার মাধ্যমে মুসলিমদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা দূর্বীসহ করে তুলে। কোনো বিকল্প না থাকায় মুসলিমরা ভক্ষককে রক্ষক ভেবে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। তারপর, জৌতিবাবুরা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে মুসলিমদের আনুগত্য দাবি করেন। তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্র বুঝতে মুসলমানদের তিন দশকের বেশি সময় লাগলো। মুসলিমরা আনুগত্য পরিবর্তনের জন্য যখন চঞ্চল হয়ে উঠলো, তখন তৃণমূল কংগ্রেসের আবির্ভাব হলো। মমতাময়ী মমতা বললেন, মুসলিমরা তাদের আশির্বাদের হাত তাঁর মাথায় দিলে তাদের দীর্ঘ বঞ্চনার পরিসমাপ্তি করবেন। তাঁর শাসনের অষ্টম বছরে মুসলিমরা হিসেব করছে। নিরাপত্তাহীনতা ও কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে তাদের জীবনের গুণগত কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা। কিন্তু বিকল্প কোথায়? এদেশের একমাত্র জনগোষ্ঠী মুসলিমরা অন্যের জন্য রাজনীতি করে। যেমন তারা তৃণমূল বা কংগ্রেস করছে বিজেপির উত্থান ঠেকানোর জন্য। ক্ষমতার হিস্সা পাওয়ার জন্য নয়। ক্ষমতার হিস্সা তাদের কেউ দেয়নি। কেউ দেবেনা। তারা এখন ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার ঠিকাদার!

Comment

Please enter your comment!
Please enter your name here