উদ্ভুত পরিস্থিতি, বিতর্ক ও বিতন্ডা (৪১)। ড. নূরুল ইসলাম

অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম
অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম

ড. নূরুল ইসলাম, পিপিএন বাংলা: সময় ও তরঙ্গ কারো পরোয়া করেনা। কারো অপেক্ষা করেনা। টিকে থাকতে তার গতি ও প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়।

তবে মানুষের জীবনে এই মূলনীতি সার্বজনীন ও শাশ্বত নয়। তাগুত বা অসত্য কখনো, সাময়িক হলেও সময় ও তরঙ্গের নিয়ামক হয়। তখন সত্যের পথিক জীবন পণ করে সময় ও তরঙ্গের প্রবাহের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে উদ্যত হয়। কখনো তারা সফল হয় আবার কখনো ব্যর্থ হয়।

আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতি মুসলিম জাতির অনুকূল নয়। বরং ভয়ানক প্রতিকূল। ইসলাম ও মুসলমানদের ঘোষিত শত্রুরা প্রবল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত। যারা শুধু মাত্র প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধিতা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার জন্য বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত হয়েছে। ধরে নেওয়া হয়, তাদের নির্বাচিত করেছে তাদের নিজ নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তারা কেউ নির্বাচিত আবার কেউ মনোনিত। যেভাবেই হোক তারা রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী। এই সব ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার পূজারীরা বিভেদ ও বৈষম্যকে হাতিয়ার করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করবে। এটাই স্বাভাবিক।

এই অস্থিতিশীল, অসহিষ্ণু ও অশান্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকতে হলে ও বেঁচে থাকতে হলে সুসংহত কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। দূর্বল ও সংখ্যালঘুদের সব সময় সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পক্ষে থাকতে হয়। কারণ সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি তাদের অস্তিত্বের জন্য আবশ্যক। যাদের পক্ষে সংখ্যা ও শক্তি আছে তাদের বিরুদ্ধে যাওয়া নির্বুদ্ধিতা ও আত্মহত্যার শামিল।

ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় সুদীর্ঘ সময় ধরে এই নীতি অনুসরণ করে চলেছে। তাসত্ত্বেও, তাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও তাদের ওপর আক্রমণের মাত্রা কমেনি।

তবুও, তাদের এই নীতি থেকে সরে আসা যাবেনা। বরং আরোও সক্রিয় হয়ে শান্তি ও সম্প্রীতির এবং ঐক্য ও সংহতির পক্ষে লড়াই করতে হবে।

বস্তুতঃ জনগণ সরল ও সহজ। অনেকটা নির্বোধ ও অলস। বিষয়ের গভীরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। প্রায়শঃ তাৎক্ষনিক আবেগ ও উত্তেজনায় তারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।

দেশের বুদ্ধিজীবি শ্রেণির মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য মানুষকে সঠিক দিশা দেওয়া। সৃজনশীল ও গঠণমূলক আদর্শ ও নীতি উদ্ভাবন করা। মানুষের চিন্তা ও চেতনার অভিমুখ সঠিক ও ইতিবাচক করা।

আজ এক শ্রেণির মানুষ নেতিবাচক আদর্শ ও নীতিতে বিশ্বাসী। তারা সর্বক্ষণ প্রচার করে চলেছে হিন্দুদের ও হিন্দুত্বের শত্রু ইসলাম। এদেশের মুসলমানরা গৃহ শত্রু। পাকিস্তান (চিন না) একমাত্র বহিঃশত্রু। এই কৃত্রিম শত্রুদের বিরুদ্ধে রণকৌশল ও যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রয়োজন। প্রস্তুতি বহু দিন ধরে চলছে। তার এখন চুড়ান্ত পর্ব।

মুসলিম ভাইদের কাছে আবেদন, নীতি ভ্রষ্ট হলে চলবেনা। নিজেদের সম্মান ও স্বাতন্ত্রতা রক্ষা করে ঐক্য ও সংহতির পক্ষে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

আমার প্রস্তাব, মিশ্র বসতিপুর্ণ গ্রাম ও শহরে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কমিটি’ অথবা ‘ঐক্যমঞ্চ’ গড়ে তুলতে হবে। এই কমিটি গঠিত হবে স্থানীয় সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি, উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ও সরকারি আমলাদের নিয়ে। এই কমিটি সমগ্র বছর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মতবিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। মৈত্রী ও ঐক্য গড়ে তুলতে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা করবে। এজন্য ভন্ডামি ও কৃত্রিম আচরণের প্রয়োজন নেই। মুসলিম ভাইদের হিন্দু দেব-দেবীর পূজা করতে হবেনা। অনুরূপ, হিন্দু ভাইদের টুপি পরে পীরের দরগায় চাদর চড়াতে অথবা উপবাস না করে ইফতার করতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এটা নিছক ভন্ডামি। প্রতারণা। পারস্পরিক মর্যাদা বোধ থাকলেই হবে।

যারা সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত তাদের বলছি। আল্লাহর ওপর আস্থা রাখুন। আমার মনে হয়, মুক্তি সংগ্রাম বা প্রতিরোধ আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে বহু মানুষ আছেন। তাদের মেরুকরণ করুন। তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের ঐক্য ও সংহতির পক্ষে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

তবে, আত্মসম্মান বন্ধক রেখে নয়। আত্মমর্যাদা ও আত্মরক্ষা বিশ্বজনীন অধিকার। কেউ আঘাত হানলে কাপুরুষের মত আর্তনাদ ও ফরিয়াদ নয়। এই জমিনের সার্বভৌম অধিকার বিশ্ব স্রষ্টার। মহান আল্লাহ।
বি: দ্রঃ – লেখক এর নিজস্ব মতামত, পিপিএন বাংলা লেখার কোনরূপ পরিবর্তন করেনি। এর জন্য পিপিএন দ্বারা দায়ী নয়।

Comment

Please enter your comment!
Please enter your name here