বিতর্ক ও বিতণ্ডা (৬৪) বর্তমান রাজনীতিতে মুসলিমদের অবস্থান : অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম

অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম, পিপিএন বাংলা: ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক অবস্থান বড় জটিল। সিদ্ধান্তহীন। বিভ্রান্তিকর। অস্পষ্ট। অনিশ্চিত। দোদুল্যমান। তারা সংখ্যালঘু কিন্তু বৌদ্ধ ও জৈনদের মত গুরুত্বহীন নয়। তাদের সংখ্যা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মিলিত জনসংখ্যার সমান। তা সত্ত্বেও তারা অবাঞ্ছিত। রাজনৈতিক গুরুত্বহীন এক জনগোষ্ঠী। তারা দেশ নির্মাণে সমান অংশীদার নয়।

তাদের অধিকার ও অবস্থানের কথা ভেবে অনেকেই এখন তুলনা করেন, ব্রিটিশ মনার্কি না হিন্দু ডিমোক্রাসি কোনটা নিকৃষ্ট বা উৎকৃষ্ট তাদের জন্য। কোন্ শাসন ব্যবস্থায় তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও ধর্মীয় অধিকার আপেক্ষিকভাবে সুরক্ষিত? তখন সরকারি স্থাপনায় গির্জা, মসজিদ ও মন্দির নির্মাণ করার সুযোগ দিত। হিন্দু গণতন্ত্রে শুধুমাত্র হিন্দু মন্দির নির্মাণের অনুমতি আছে। রেল ষ্টেশনে, বাস ষ্ট্যান্ডে, প্রতিটি থানায়, প্রায় প্রতিটি সরকারি স্থাপনায় ও ফুটপাতে ও মোড়ে মন্দির নির্মিত হয়েছে বা হচ্ছে। বিজয়ের স্মারক রূপে। কোনো মুসলমানের হিম্মত নাই থানায় বা ষ্টেশন সংলগ্ন সরকারি স্থানে মসজিদ নির্মাণ করবে। প্রতি মুহূর্তে তারা বোঝাতে চায়, তারা বিজয়ী আর মুসলিমরা তাদের অনুগ্রহ প্রার্থী। এদেশ তাদের। মুসলিমরা অবাঞ্ছিত।

বস্তুতঃ বিজয়ী বা প্রভাবশালীরা ইতিহাস নির্মাণ করে। তারাই সাধারণ মানুষের ভাবনার গতিপথ নির্ণয় করে। বিজিত ও প্রভাবহীনদের ভাবনা ও বঞ্চনার উপাখ্যান সব সময় উপেক্ষিত থাকে। একথা ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তাদের প্রতি বঞ্চনা, বৈষম্য, বিদ্ধেষ, সহিংসতা ও শত্রুতার উপাখ্যান উপেক্ষিত।

ব্রিটিশ ভারতে সরকার বিরোধী আন্দোলন তথা মুক্তি সংগ্রামের ধারা এক ও অভিন্ন ছিলনা। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও একই ছিলনা। হিন্দুরা হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠা আর মুসলিমরা মুসলিম বাদশাহাত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর ছিল। ১৮৫৭ সালের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পর মুসলিমরা বাদশাহাত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পরিত্যাগ করে। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বা বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়। এদেশের মূল দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্ন অবস্থানের জন্য ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘতর হয়। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা দেশ ছাড়েন। বিশ্ব রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে।

স্বাধীনতার প্রাক কালে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৃষ্টি করে। ভয়ানক রূপ ধারণ করে সংঘর্ষ ও সহিংসতা।

এই প্রেক্ষাপটে দেশ বিভাজিত হয়। জিন্নাহর মত এক অধার্মিক ও উগ্র সেক্যুলার মানুষ বিভাজনের পক্ষে উকালতি করেন। আর হিন্দু সেক্যুলার পন্থিরা স্বর্ণ সুযোগ রূপে তা গ্রহণ করে।

দেশ প্রেমের প্রশ্নে, ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় কত সেক্যুলার ও দেশপ্রেমী তা দেশ ভাগের পূর্বে প্রমাণ দিয়েছে। পরেও প্রমাণ দিয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে অসংখ্যা বার তারা হিন্দু এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী জাতীয় কংগ্রেস দলকে ভোট দিয়েছে। যদিও তাদের কাছে স্বাধীনতার পূর্বে মুসলিম লীগ ও স্বাধীন ভারতে মুসলিম দল গঠন করে রাজনীতি করার সুযোগ ছিল। স্বাধীনতার পূর্বে তারা একাধিক বার মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশ বিভাজনের নীতি ও সিদ্ধান্ত তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। বাই চয়েস তারা এদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে শত শত দাঙ্গা ও গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পরও তারা পাইকারি হারে দেশত্যাগের কথা ভাবেনি। আবার তারা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবেনি। তারা শুধু সেক্যুলার হিন্দু দল খুজেছে। যে দল সমাংশদারিত্বে বিশ্বাসী হবে। কিন্তু তারা কখনই তা পায়নি। কংগ্রেস সেক্যুলার নয়। তার হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার শত শত নজির আছে। হিন্দু নেতৃত্বাধীন বামপন্থী দলগুলোও ধর্মনিরপেক্ষ নয়। হিন্দু নিম্ন বর্গের দলগুলোও কম মুসলিম বিদ্ধেষী নয়। গত সাত দশক মুসলিমরা ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাংশদারিত্বে বিশ্বাসী কোনো রাজনৈতিক দল খুজে পায়নি। সত্য বলতে কি, এদেশের শিক্ষিতদের বড় একটি অংশ ভয়ানক মুসলিম বিদ্ধেষী। তারাই রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, শিল্প ও সাহিত্যাঙ্গনকে সাম্প্রদায়িক রঙে কলুষিত করছে।

আগ্রাসী হিন্দুত্ব কংগ্রেস, তৃণমূল, বামপন্থী ও আঞ্চলিক হিন্দু রাজনৈতিক দলগুলোর হিন্দু এজেন্ডা বাস্তবায়নে সন্তুষ্ট নয়। তাই, তারা এখন ফ্যাসিবাদী হিন্দু দল আর এস এস এস-বিজেপিকে ক্ষমতাসীন করে মুসলিমদের শিক্ষা দিতে চায়। তবে, আমরা অচিরেই দেখতে পাব মুসলিম ছাড়া একশো কোটি ভারতীয় কতটা সুখী হয় এই রাম রাজত্বে। হিন্দু সেক্যুলার পন্থিরা মুসলিমদের ভাতে মেরেছে। তাদের অবাঞ্ছিত করেছে। ফ্যাসিবাদী বিজেপি তাদের দেশ ছাড়া করতে চায়। দেখা যাক। ইতিহাসের গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়।

আমাদের বিশ্বাস, আশার আলো উৎসারিত হবে হতাশার গহ্বর থেকেই। শীঘ্রই ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হবে এ জাতি। অতীতেও বহু দুঃসময় এসেছে। মহান আল্লাহ বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রেরণ করে এ জাতিকে পতনের অতলান্ত থেকে উদ্ধার করে সমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইনশাআল্লাহ। সেদিন বহু দূরে নয়। যখন কোনো সালাহুদ্দিন, তারিক বিন যিয়াদ অথবা মুহাম্মদ বিন কাসিমের আবির্ভাব হবে।

লেখক: অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম, লেখকের নিজস্ব মতামত

Comment

Please enter your comment!
Please enter your name here