গুজরাট মডেল: গান্ধী বনাম মোদী, বিতর্ক ও বিতন্ডা (৫৮), অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম

অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম, পিপিএন বাংলা: ভারতবর্ষ এক বিশাল দেশ। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান। বহু সভ্যতার মিলনক্ষেত্র। অসংখ্যা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং ধর্ম ও দর্শন সমৃদ্ধ করেছে তার ঐতিহ্যকে। অন্যদিকে, এ বৈচিত্র্য সুদীর্ঘ এক অন্তর্লীন সংঘাত ও সংঘর্ষের ইতিহাস কলংকিত করেছে তার গৌরবকে। আর্য-অনার্য সংঘাত থেকে শুরু করে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ কয়েক সহস্রাব্দ ধরে অব্যাহত ধারাবাহিক এক কলংকিত ইতিহাস।

আধুনিক ভারতে এক সময় বাঙালিরা অবশিষ্ট ভারতকে দিশা দেখিয়েছে। পরবর্তী কালে, এক সময় মারাঠিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর গোবলয়ের প্রাণকেন্দ্র উত্তর প্রদেশ দীর্ঘ সময় দেশের রাজনৈতিক শক্তির ভরকেন্দ্র হয়ে উঠে।

কিন্তু সম্প্রতি দেশের শক্তির ভরকেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়েছে গুজরাটে। এখন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে দেশের সকল শক্তির ভরকেন্দ্রগুলি এখন গুজরাটিদের অধীন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে উল্কার মতো আবির্ভাব হয় গান্ধীর। সহিংস ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অভিমুখ তিনি ঘুরিয়ে দেন। অল্প সময়ে অসামান্য প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। শ্রী সর্দার প্যাটেল তাঁর সৃষ্টি। প্যাটেলের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক কারিশমা ছিলনা। তবে তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। দেশের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি কোনো মতেই দলের দায়িত্বে থাকবেন না। অবশেষে, সিদ্ধান্ত হলো, তাঁর স্থলাভিসিক্ত হবেন জওহারলাল নেহরু। কিন্তু সর্দার প্যাটেল সম্ভাব্য বলিষ্ঠ প্রার্থী ছিলেন। আজকের মতো সেসময় জাতীয় কংগ্রেসে আর এস এস পন্থি একটি শক্তিশালী গোষ্ঠি সক্রিয় ছিল। তারা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তাদের নেতৃত্ব দিতেন সর্দার প্যাটেল। তবে তখন গান্ধী অথবা প্যাটেলের জন্য গুজরাট মডেল বলে কিছু ছিল না।

গান্ধীর মৃত্যুর সঙ্গে গুজরাটের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়। গান্ধীকে হত্যা করে একজন মারাঠি। তা সত্ত্বেও কখনো কেউ মারাঠি বনাম গুজরাটি সংঘাত হিসেবে দেখেনি। এটা ছিল আদর্শ ভিত্তিক লড়াই। গান্ধীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতার অপমৃত্যু হয়নি। নেহরু পরিবার এই হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য আরো কিছু কাল বহন করতে সক্ষম হয়।
গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্য শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে তারা ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করে।

এসময় নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে চরমপন্থী উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি-আর এস এস গুজরাটকে হিন্দু রাষ্ট্রের আদর্শ নমুনা বানায়।

নব্বইয়ের দশকে হিন্দু উগ্র জাতীয়তাবাদী বিজেপি-আর এস এসের দুটি শিবির ছিল। নরমপন্থীদের নেতৃত্বে ছিলেন অটল বিহারী আর চরমপন্থীদের নেতৃত্বে ছিলেন আদবানি। ভাগ্যের পরিহাস! আদবানির যোগ্য উত্তরাধিকারী মোদী! গুরুজীকে অপমানজনকভাবে দূরে সরিয়ে তিনি এখন নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক শক্তির অধিকারী।

নরেন্দ্র মোদী অসাধারণ কৃতিত্ব কি? সে বিষয়ে বিভিন্ন জনের ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। কেউ বলেন, তিনি অসাধারণ বাগ্মী! কেউ বলেন, তিনি অসাধারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কান্ডারী! কেউ বলেন, তিনি অসাধারণ প্রশাসক! কেউ বলেন, তিনি দুঃসাহসী রাজনীতিবিদ। কেউ বলেন, তিনি আর এস এস আদর্শের যোগ্য শিষ্য ও রূপকার।

বস্তুতঃ নরেন্দ্র মোদীর অসামান্য সাফল্যের রহস্য আর এস এস উদ্ভাবিত ইসলাম, মুসলিম ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ঘৃণা, হিংসা, বিদ্ধেষ ও শত্রুতাকে হিন্দু মেরুকরণে শৈল্পিক রূপদান।

তাঁর উদ্ভাবিত উন্নয়নের গুজরাটি মডেল ব্যর্থ হওয়ার পরও নির্বাচনী সাফল্যকে ব্যাখ্যা করার আর কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয়নি। এখন গুজরাটি উন্নয়ন মডেল ব্যর্থ। তবে, গুজরাটি উগ্র হিন্দুত্ব মডেল দারুন সফল। মুসলিমদের সামাজিকভাবে বয়কট, অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন করার মূলনীতির সফল বাস্তবায়ন চলছে। দলিত ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তাদের চিহ্নিত শত্রু। তারাও রাম রাজত্বের সুফল পেতে শুরু করেছে।

কিছু নির্বোধ দিবাস্বপ্ন দেখছে, মুসলমানদের নির্মূল করে, এদেশে তারা স্বর্গীয় সুখ ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করবে।

ওদের বলুন। তোমাদের অতীতকে স্মরণ করো। আবেগ নয় বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করো। কবে তোমরা এদেশে স্বর্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলে?

পূনশ্চঃ হিন্দুত্বের এই উন্মাদনা ক্ষণস্থায়ী। মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি কামনা করে। এগুলো বিঘ্নিত হলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী হবে। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ইনশাআল্লাহ। পরিবর্তন আসছে।

Comment

Please enter your comment!
Please enter your name here