ঘৃণার মনস্তত্ত্ব: বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৮)

ঘৃণার মনস্তত্ত্ব: বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৮)
ঘৃণার মনস্তত্ত্ব: বিতর্ক ও বিতন্ডা (৩৮)

ড. নূরুল ইসলাম, পিপিএন বাংলা: ঘৃণা ভয়ানক এক মারণাস্ত্র। বিষ্ফোরকের চেয়েও ভয়ঙ্কর। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই অস্ত্রের কার্যকর সক্ষমতা সুদূরপ্রসারী। এই বিধ্বংসী মারণাস্ত্র অতীতে বহু জাতিকে ধ্বংস করেছে। খ্রিস্টানরা ইহুদীদের ছিন্নমূল করেছে। গণহত্যা সংঘটিত করেছে। প্রায় দু’হাজার বছর এই অপকর্ম ও অপরাধ করেছে। আর্যরা প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে অবদমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে এদেশের মূলনিবাসী অনার্যদের। তাদের বিরুদ্ধে এই অস্ত্রের সফল প্রয়োগ হয়ে চলেছে। আর বর্তমান বিশ্বব্যাপী প্রতিটি সংঘাত ও সংঘর্ষের মূল অনুঘটক এই ঘৃণার মনস্তত্ত্ব। এখন ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয়ানক ঘৃণা ও বৈষম্যের অভিযান চলছে। ঘৃণার পূজারী আর্য বর্ণ হিন্দুরা দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে ঘৃণার মনস্তত্ত্ব প্রয়োগ করে চলেছে। দেশের অমিত রাষ্ট্রশক্তিকে তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রক্রিয়ায় সুসংহতভাবে চলছে এই অভিযান। যার পরিণতি লক্ষ করছি। দেশের ২০-২৫ কোটি মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়ানক অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্য। সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা।

সকল বিজয়ী শক্তি দূর্বল ও বিজিতদের বিরূদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদী রণকৌশল রূপে ঘৃণার মনস্তত্ত্ব প্রয়োগ করেছে।
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এক অপরকে হীনতর ভাবা। এই মনস্তত্ত্বকে জাত্যাভিমান বলে।

ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা আজও নিজেদের পৃথিবীর উৎকৃষ্টতম জীব ভাবে। পৃথিবীর অবশিষ্ট মানুষকে তারা হীনতর জ্ঞান করে। অধম ভাবে। আরবরা আজও অনারবদের হীনতর ও নিকৃষ্টতর মনে করে।

ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে এই অস্ত্রের ব্যবহার আরো রূঢ় । এদেশে বর্ণ হিন্দুরা দীর্ঘ মেয়াদী অস্ত্র রূপে ঘৃণার মনস্তত্ত্বকে ভয়ঙ্করভাবে কার্যকর করেছে। এই অস্ত্রের আঘাতে ধরাশায়ী প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী নিম্ন বর্ণের অনার্য শক্তি। কয়েক সহস্রাব্দ ধরে অনার্য সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ঘৃণার বলি। এখন অবলীলায় তারা মেনে নিয়েছে, তারা আর্য বর্ণ হিন্দুদের চেয়ে অধম ও হীনতর। তারা এখন এটা ভাবতে অপরাধ বোধ করে যে, তারা বর্ণ হিন্দুদের শাসন করবে। তারা নেতা হবে আর তাদের অনুগত হবে তথাকথিত উচ্চ বর্ণের হিন্দু।

শুধু কি তাই? এই তথাকথিত অধম হিন্দুরা আবার মুসলিম ও খ্রিস্টানদের তাদের চেয়ে আরো অধম মনে করে। আবার তথাকথিত প্রতিটি অধম হিন্দু সমগোত্রীয় অপর হিন্দুকে তাদের চেয়ে আরো অধম ভাবে। শত শত স্তর। কেউ কারো সমকক্ষ নয়। কাস্ট ও সাব-কাস্ট। ঘৃণা ও বৈষম্য যার ভিত্তি মূল।

মানুন আর না মানুন। এটা ঐতিহাসিক সত্য। ইসলাম এই পারস্পরিক ঘৃণা ও বৈষম্যের মনস্তত্ত্বকে ধ্বংস করতে প্রয়াসী হয়েছে। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে যে, এই অভিযান একশো শতাংশ সফল হয়নি। ইসলাম ঘৃণা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের মূলনীতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়াসী হয়। ঘৃণা ও বৈষম্যের মনস্তত্ত্বকে চরম অপরাধ বলে ঘোষণা করে। শুধু মাত্র এই মূলমন্ত্রে অভিভূত হয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।

আজ সময় এসেছে, পৃথিবীর সব দাম্ভিক ও স্বঘোষিত উৎকৃষ্টদের সহস্রাব্দ ধরে প্রচলিত ঘৃণা ও বৈষম্যের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সাম্য ও শান্তির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ মুক্তি সংগ্রাম শুরু করতে হবে। অন্যথা নৈরাজ্য আমাদের সকলকে অচিরেই গ্রাস করবে।

Comment

Please enter your comment!
Please enter your name here